আগুনে ঝলসে গেছে পুরো শরীর। মুখমন্ডল দেখেও চেনার উপায় ছিলো না। তাই কাউকে দেখতে দেওয়া হয়নি। মা-বোনও দেখতে পারেননি শেষ দেখা। শুধু সাদা কাপাড়ে মোড়া নিথর দেহটি বাইর থেকে দেখেছে সবাই। আর দাফনের মধ্যদিয়ে শুধু ওসমানের লাশের সমাধিস্থ হয়নি, সমাধিস্থ হয়েছে পুরো পরিবারের স্বপ্নও। শোকার্ত হৃদয়ে কথাগুলো বললেন বাহরাইনের রাজধানী মানামার মুকারকা এলাকায় অগ্নিকান্ডে নিহত ওসমান গনির ভগ্নিপতি বেলাল ভূঁঞা।

বুধবার নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার বারগাঁও ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে ওসমান গনির (২৩) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৯টায় কাশিপুর গ্রামের হেঞ্জু ব্যাপারী বাড়িতে শত শত গ্রামবাসী ও আত্মীয় স্বজনের অংশগ্রহণে নামাজে জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে বুধবার ভোর ৩টায় আঞ্জুমানের মফিদুল ইসলামের এম্ব্যুলেন্সে করে ওসমানের মরদেহ পৌঁছে গ্রামের বাড়িতে। এখবর ছড়িয়ে পড়লে ভোর থেকেই শত শত মানুষের ভীড় জমে বাড়িতে।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, আগুনে জ্বলসে গেছে ওসমানের পুরো শরীর। তবুও সাদা কাপড়ে মোড়ানো দেহটিই দেখতে সমাগম মানুষের। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম আর প্রিয় মানুষটির সাদা কাপড়ে মোড়ানো নিথর শরীর দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছে স্বজনরা। মা ছাদিয়া বেগম আর বোনদের কান্নায় ভারী হয়ে যায় পুরো বাড়ি। যেন কান্নার শব্দ ছাড়া কোন শব্দই নেই। শুধু চিৎকারে শোনা যায় একটি শব্দ ‘ওসমান’। ৮ বছর বয়সি ওসমানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম জীব বাড়িতে আসা শত শত মানুষের ভীড়ে শুধু খুঁজে বেড়ায় প্রিয় ভাই ওসমানকে। ওসমানের মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকরে কাঁদছিলেন বড় বোন রোজিনা।
পারিবারিক সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অগ্নিকান্ডে নিহত অন্যদের সাথে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এসে পৌঁছে ওসমান গনির মরদেহ। সেখানে লাশ গ্রহণ করতে যাওয়া নিহতদের আত্মীয় স্বজনদের সাথে বৈঠক হয় শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেনের। এসময় শ্রমমন্ত্রী প্রতি পরিবারের জন্য ২ লাখ টাকা করে সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হবে বলে জানান। এছাড়া দাফনের জন্য দেওয়া হয় ৩৫ হাজার টাকা। রাত ৯টায় ওসমানের মরদেহ বুঝে নেয় স্বজনরা।
ওসমানের ভগ্নিপতি বেলাল ভূঁঞা  আরো জানান, বাহারানে ওসমান গণীর ৪ মামা, ২ খালাতো ভাই ও ১ জন ফুফাতো বোনের স্বামী থাকেন। তাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে কয়েক বার। তবে; বাহারাইন সরকার কিংবা কর্মস্থলের মালিকের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পাবে কিনা এখন তাঁরা জানেন না। এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণাই ওসমানের পরিবারের একমাত্র ভরসা।
জানাজায় অংশ নেওয়া বারগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক দুলাল  বলেন, সরকারের তরফ থেকে ইউনিয়ন পরিষদে দরিদ্র মানুষের সাহায্যার্থে যতো বরাদ্দ আসবে সেখান থেকে ওসমানের পরিবারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদের সভায় তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে বাহরাইন সরকার ও কোম্পানীর কাছ থেকে নিহতের পরিবারের জন্য সহযোগীতা কামনা করেন তিনি।
উল্লেখ্য- স্থানীয় কাশিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করা ওসমান ৩ বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিলো তৃতীয়। গত ১১ জানুয়ারি রাজধানী মানামার মুকারকা এলাকায় অগ্নিকান্ডে নিহত হন ওসমান গনি। ওসমানের পিতা আব্দুর রহিমও ছিলেন বাহরাইনে প্রবাসী। দুই মেয়েকে তিনি বিয়ে দেন। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে দিকে ছুটিতে বাড়িতে এলে অসুস্থ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন এ সংবাদ শুনে আব্দুর রহিমের কোম্পানীর মালিকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। কোম্পানী পরিবারের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে ওসমানকে বাহারাইনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ২০০৮ সালের শুরুতে সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে শ্রমিকের চাকরি নিয়ে পাড়ি জমান বাহরাইনে। এরই মধ্যে ছোট বোন সীমাকে বিয়ে দেন ওসমান। সর্বশেষ ছুটিতে এসে গত বছরের ২ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে যান ওসমান। কথা ছিলো ফিরে এসে বিয়ে করবেন। কিন্তু আগুনে পুড়ে নিজেই এখন চলে গেছেন না ফেরার দেশে।