স্যার আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমি সে বিশ্ববিদ্যালযের ছাত্র। সুতরাং যেকোন ক্ষেত্রেই আমি আপনার চেয়ে কম বুঝি এটাই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক “তোমরা যারা শিবির কর” শিরোনামে আপনার একটা লেখা পড়ার পর আর বসে থাকতে পারলাম না। এত বড় মাপের মানুষ এত বিশাল মিথ্যার মহাসাগরে হাবুডুবু খায় কি করে? আপনার লেখাটা পড়ার পর ভাবলাম গতানুগতিক কোন বিষয়ে লেখে লাভ নেই। এ ধরনের লেখা প্রায় সবাই লেখে, সবাই পড়ে, সবাই শুনে । কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু হয় না। শুধু হিংসা বিদ্বেষের বীজ বপন ছাড়া। সেজন্য চিন্তা করলাম আমার দেখা জামায়াত শিবিরের কিছু কর্মকাণ্ড এবং তাদের ব্যাপারে আপনাদের বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির কিছু বিষয়ে ওপেন চ্যালেঞ্জ করব (যদি দঃসাহস মনে না করেন)। যদিও জামায়াতে ইসলামীর লোকদের সাথে হ্যান্ডশেক করেন না এবং শিবিরের ছেলেদের সাথে ধমকের সুরে কথা বলেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস দেশ ও জাতির স্বার্থে, জামায়াত শিবির মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বার্থে, তরুণ প্রজন্ম কে জামায়াত শিবির হতে দূরে রাখার স্বার্থে এবং আমরা যারা ইতিমধ্যে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছি, তাদেরকে সুপথে আনার লক্ষ্যে হলেও অন্তত আপনি এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেন। আপনি যদি ইচ্ছুক হন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত সেন্ট্রাল অডিটরিয়ামে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার আয়োজন করা হবে, ইনশাল্লাহ। আমরা শাবি পরিবার ইতিমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, যেমন ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রথম পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন, ওয়াই ফাই সমৃদ্ধ ক্যাম্পাস, মেয়েদের আত্মরক্ষার জন্য ক্যারাতে শিখানো ইত্যাদি। তাই আসুন না জামায়াত- শিবিরের সাথে ওপেন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা বা ডিবেট করার মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এই উদ্যোগ সংঘাত সংঘর্ষময় রাজনীতি পরিহার করে সুস্থ ধারার রাজনীতি ও নিজ নিজ আদর্শের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে ও মাইলফলক হবে বলে মনে করি। সে যা হোক এবার কিছু বিষয় আলোকপাত করা যাক- 

প্রথমত 
আফ্রিকার গহীন অরণ্য বনভূমি আমাজান যেটি এতই আবিশ্বাস্য ও লোমহর্ষক যে ঐ জঙ্গলের শুধু মাত্র একটি গাছেই পৃথিবীর পাঁচ ভাগের এক ভাগ জীব বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। শুধু তাইনা প্রতিদিন কম পক্ষে তিনটি করে নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কার হচ্ছে। মিডিয়ায় সামনে বসলে মনে হয় জামায়াত- শিবিরকে শুধু নিষিদ্ধ বা নিশ্চিহ্ন বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে সবাই মিলে ঐ গহীন জঙ্গলে পাঠিয়ে দিই। তাই মিডিয়া বা অন্য কেউ কি বলল এটার উপর ভিত্তি করে আমি আপনাকে প্রশ্ন করব না। প্রথমে আপনার এবং আমার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া একটি জঘন্য বর্বরতাকে কেন্দ্র করে চ্যালেঞ্জ করতে চাই। ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি, যেদিন আপনাদের ভাষায় কুখ্যাত রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী অধ্যাপক গোলাম আজমকে গ্রেপ্তার করা হয়। শাবিপ্রবির ইতিহাসে ছাত্রশিবিরকে ঘিরে ঐদিন যে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছে, তার স্বাক্ষী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় ৯ হাজার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকবৃন্দ, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এলাকাবাসী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রায় সাড়ে তিন বছরে ছাত্র শিবিরের সাথে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও ঐদিন বিকাল বেলা উন্মাত্ত ছাত্রলীগ প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের দল-বল নিয়ে ছাত্রশিবিরের নির্দোষ-নিরপরাধ ও হলের বৈধ ছাত্রদেরকে অত্যন্ত নির্দয়, নিষ্ঠুর ও অমানবিক কায়দায় এক কাপড়ে হল ত্যাগ করতে বাধ্য করে। স্যার আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে এতবড় একটা অন্যায় ঘটে যাচ্ছে, অতচ আপনি নিরব ছিলেন কেন? যে মুক্তিযুদ্ধের গান আপনি আমাদের শুনান, যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি টকশো করেন, যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা গর্ব - অহঙ্কার করি, সেই মুক্তিযুদ্ধকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য নবনির্মিত ‘চেতনা ৭১’ এর পাশে আপনি, আপনার সহধর্মীনী জনাব প্রফেসর ড. ইয়াসমিন ম্যাডাম ও মাননীয় ভিসি মহোদয় সহ প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষকবৃন্দ জড়পদার্থের মত হা করে তাকিয়ে ছিলেন। নিরপরাধ ও হলের বৈধ ছাত্রদেরকে হায়েনাদের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচানোর কোন উদ্যোগ নেননি বরং শত শত র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করেছেন। এই নির্মম সত্যটুকু মিডিয়ার অপব্যবহার বা তথ্য সন্ত্রাসের কারণে বাংলাদেশের প্রায় সকল জনগণ উল্টোভাবে দেখেছে, শুনেছে, বুঝেছে, শুধুমাত্র আপনাদের কারণে। প্রচার-প্রচারণা চালানো হলো “ছাত্রলীগের আনন্দ মিছিলে শিবিরের হামলা।” এটিই কি আপনাদের সোনার বাংলা? এটিই কি আপনাদের ন্যায়ের শাসন? এটিই কি চেতনা ৭১? 
মিডিয়ার প্রচার প্রচারণা দেখে যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন হওয়ার জন্য ছাত্রশিবিরকে নসিহত করেছেন। আমরা কোন মিডিয়াকে বিশ্বাস করব, আমরা কাদেরকে বন্ধু ও নিরপেক্ষ হিসাবে ভাবব, আমার উপস্থিতিতে আমার চোখের সামনে আমার প্রত্যেকটি শিরা-উপশিরা অনুভব করল যে ঘটনা, তাকে তারা পরিবেশন করল সম্পূর্ণ উল্টোভাবে, তাদের কথায় আমরা বিভ্রান্ত হব! আমরা তরুন প্রজন্ম, আমরা ছাত্রশিবির, আমরা ৭১ দেখিনি, কিন্তু ঐদিন আমাদের প্রিয় হলে কী পরিমান লুটপাট হয়েছে দেখেছি, আগুনের লেলিহান শিখা প্রত্যক্ষ করেছি, মূল্যবান সম্পদ ভাঙ্গার শব্দে হৃদয়ে প্রকম্প অনুভব করেছি, আরো দেখেছি কীভাবে নিজেরা জুলুম করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়। 

দ্বিতীয়ত, 
চোরে শুনেনা ধর্মের কাহিনী। যারা আল্লাহকে ভয় করে, আল কোরআনকে বিশ্বাস করে, রাসুল (সঃ) কে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও তার আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাঁরা কখনো অর্থলোভী বা অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হতে পারে না। যে কোন দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে যদি আর্থিক স্বার্থ বা পার্থিব কোন সুযোগ-সুবিধা জড়িত থাকে, তাহলে ঐ দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা, মারামারি বা গ্র“পিং হওয়া অনিবার্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলকে টেনে আনতে পারি। যে ছাত্রশিবিরের ছেলেদের সাথে আপনি ধমকের সুরে কথা বলেন, তাদের মধ্যে কি মারামারি বা গ্র“পিং হতে দেখেছেন? দয়া করে লেখাটি পড়ার সময় আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনার দিকে তাকাবেন এবং হাইপোথেটিক্যাল দৃষ্টান্ত দিয়ে নিজেকে বুঝ দেওয়ার ব্যার্থ চেষ্টা করবেন না। এক্ষেত্রে আমি আপনার সাথে চ্যালেঞ্জ করলাম অর্থের লোভে সাধারণ ছাত্ররা শিবির করে বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা ডাহা মিথ্যা। মাঠ পার্যায়ের খবর নিলে দেখবেন সাধারণ ছাত্ররা শিবির করে অর্থ নেয়া নয়, বরং দেওয়ার জন্য। একজন সাধারণ ছাত্র সমর্থক থেকে যখন কর্মী হতে চায়, তখন তার কাছ থেকে কর্মীর ৪ টি বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে সম্মতি আদায় করা হয়। তার মধ্যে একটি হল “নিয়মিত এয়ানত বা আর্থিক সাহায্য দেওয়া।” কর্মী থেকে সাথী হলে “নিয়মিত এয়ানত বা আর্থিক সাহায্য দেওয়া বাধ্যতামূলক। আর ছাত্রশিবিরের সদস্যরা কি পরিমান সময়, শ্রম ও অর্থ দিয়ে প্রিয় সংগঠন শহীদি কাফেলাকে সহযোগিতা করে তা আপনি কল্পনা ও করতে পারবেন না। 

তৃতীয়ত 
খাও-দাও ফূর্তি কর, দুনিয়াটা মস্তবড়। যারা আল্লাহকে ভয় করে, আখিরাতকে বিশ্বাস করে, জাহান্নামের আগুনকে ভয় করে, তারা কখনো আল্লাহ সুবহানাতায়ালার হুকুম ও তাঁর রাসুলের আনীত বিধান বাদ দিয়ে আমোদ ফূর্তি করার মাধ্যমে জীবনের মূল্যবান সময় অতিবাহিত করতে পারে না। মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন- 
“সময়ের কসম। নিশ্চই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। তবে তারা ছাড়া যারা ভাল কাজ করে, করতে বলে ও ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেয়।” সূরা আল-আসর 
স্যার আমি বিশ্বাস করি আপনি মুসলমান এবং আপনার ঈমানও আছে। তাহলে শিবিরের ছেলেরা গান গায় না, একদিকে টগবগে যুবক, অন্যদিকে সুযোগ-সুবিধাও আছে, তারপরও সুন্দরী-রমনী বান্ধবীদের সাথে ঘুরা-ফেরা করে না, পহেলা বৈশাখ, ভালবাসা দিবস, থার্টি ফার্স্ট নাইট বিভিন্ন নামে বেনামে তুরুণ-তরুণীদের অবাধে মেলা মেশা করার পথ প্রশস্তকারী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে না, তাতে অপরাধ কোথায়? আপনারাইত বলেন বাঁচতে হলে জানতে হবে। শুধু অওউঝ থেকে বেঁচে গেলেই শেষ বাঁচা নয়। জাহান্নামের অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়, অন্তর পর্যন্ত পৌঁছানো আগুনের চিরস্থায়ী তেজ হতে বাঁচতে হলে ঐ সমস্ত পশুবৃত্ত ও আমোদ-ফূর্তির কঠিন ও কঠোর পরিণাম সম্পর্কে মৃত্যুর আগেই সজাগ ও সচেতন হওয়া জরুরী। সময়ের একফোঢ়, অসময়ের দশফোঢ়। জনাব হুমায়ুন আহমদ স্যার চলে গেছেন। আমরাও চলে যাব, আপনিও চলে যাবেন। সুতরাং দৃষ্টি ভঙ্গি পাল্টান, জীবন পাল্টে যাবে। অন্যথায় মালাখুল মাওত এসে গেলে খবর আছে। দশফোঢ় কেন, দশ লক্ষ মিলিয়ন-বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ফোঢ় দিলেও কাজ হবে না। তাছাড়া আপনাদের আমোদ ফূর্তি করা প্রজন্ম একটি সুসভ্য জাতি গঠনে কতটা হুমকি, আপনি কি জানেন? যারা নামাজ পড়ে না, আখেরাতে বিশ্বাস করে না এবং ধর্ম-কর্ম করতে ও মানতে রাজি না, তারা কিভাবে দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করে, আপনি কি জানেন ? 
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে যারা মাদকাসক্ত তারা আপনার আমোদ ফূর্তি গ্র“পের সদস্য। 
ছোট ছোট বালু কণা, বিন্দু বিন্দু জল গড়ে তুলে মহাদেশ সাগর অতল। আমোদ ফূর্তির ফলাফল গড়াতে গড়াতে এক সময় অবৈধ মেলামেশা পর্যন্ত যায়। এই দায় আপনারা কিছুতেই এড়াতে পারেন না।